- Back to Home »
- Articles , Uncategorize »
- পশ্চিমি বিশ্ব এবং তার সঙ্গীরা কার্যত দর্শক আরবে গণতন্ত্র রুখতেই মিশরে রক্তপাত ?
Posted by : Sabbir Ahmad
Friday, 13 September 2013
‘মুসলিম ব্রাদারহুড ’ মানেই ধর্মীয় গোঁড়ামি ? সাম্প্রতিক তথ্য কিন্ত্ত অন্য কথা বলছে৷ ---------লিখছেনশাহনওয়াজ আলি রায়হান
পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে প্রতি দিন পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ হয়৷ ব্যতিক্রম এই মূহূর্তের মিশর৷ এখন সেখানে অনেককেই ছয় ওয়াক্ত নমাজে শরীক হতে হচ্ছে৷ অতিরিক্ত নমাজটি জানাজার , সাদা কাফনে মোড়া সারিবদ্ধ নিথর দেহগুলিকে সামনে রেখে ! আর যাঁরা গুলির শিকার হওয়া থেকে প্রাণে বেঁচে গেছেন ? যাঁরা এত সবের পরও গণতন্ত্রের পক্ষে ? মিশরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনও মতেই সেনাবাহিনীর উপস্থিতি বরদাস্ত করতে নারাজ ? রাবা -আল -আদাইয়া , রামেসিস স্কোয়্যারের হত্যাকাণ্ডের পরও দমানো যায়নি এঁদের৷ বাহুতে নাম লিখে আবার সামিল হয়েছেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে৷ নামটা লিখে রাখার কারণ হল , সেনার আক্রমণে প্রাণ হারালে মৃতদেহর স্তপ থেকে দেহগুলো সনাক্ত করা যাতে সহজ হয়৷ ১৪ অগস্ট কায়রোর রাবা -আল -আদাইয়া , আন -নাহাদা , হেলওয়ান প্রভৃতি স্থানে মিশরবাসীর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে সেনাবাহিনী ট্যাঙ্ক ঢুকিয়ে দিয়ে যে নির্মম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে , তাতে মোট কত জন প্রাণ হারিয়েছেন সেই সংখ্যাটা নিয়ে গণমাধ্যমগুলি এখনও একমত নয়৷ সেনার হিসেব অনুযায়ী ৫২৫ , বিভিন্ন সংবাদপত্রে ৮০০ -৯০০ , মুসলিম ব্রাদারহুডের দাবি নিহত দুই সহস্রাধিক এবং আহত প্রায় তিন হাজার৷ তিয়েনানমেন স্কোয়্যারের সেই নাম না জানা ‘ট্যাঙ্ক-ম্যান ’কে স্মরণ করিয়ে দেওয়া একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যাচ্ছে , মিশরিয় সেনার ট্যাঙ্কের সামনে দুই হাত মাথার উপর তোলা সত্ত্বেও গুলি খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল এক যুবক৷ সে বেঁচে গেল না মারা গেল , সে সব আর জানা যায় না ভিডিওটিতে৷ তবে যা জানা যাচ্ছে , তাতে নিহতদের মধ্যে আসমা বেলতাগির মতো প্রতি ক্লাসে প্রথম হওয়া তরুণীও যেমন ছিলেন , তেমনই আসেম -আল -গামালের মতো যুব শিল্পদ্যোগী , বা জাতীয় ফুটবল দলের সামি আদাওয়েরও মৃত্যু হয়েছে৷ আর মারা গিয়েছেন বেশ কিছু সাংবাদিক৷
এ ছাড়াও মারা গেলেন এমন অসংখ্য সাধারণ মানুষ , যাঁদের নিরলস প্রচেষ্টার ফসল ছিল মিশরে আরব বসন্তের আগমন৷ তেহরির স্কোয়ারে যে দিন তিন দশকের স্বৈরাচারী শাসক হোসনি মুবারকের পতন চেয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন , সে দিন যেমন এঁরা কেউ -ই সন্ত্রাসের তালিমপ্রান্ত ছিলেন না , তেমনই জীবনের শেষ দিনও এঁদের কারও হাতে কোনও অস্ত্র ছিল না৷ তার পরও আক্রমণের পেছনে মিশরিয় সেনার যুক্তি ছিল , বিক্ষোভকারীরা অস্ত্রে সজ্জিত থাকায় তাঁদের বিরুদ্ধে ট্যাঙ্ক নামাতে তারা ‘বাধ্য ’ হয় ! সেনার দাবি সত্য হলে প্রশ্ন হল , মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী জেনেও সেনাদের উদ্দেশে গুলি চালাতে দেখা যায়নি কেন কোনও বিক্ষোভকারীকে ? আধুনিক মিশরের ইতিহাসে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান মহম্মদ মুরসিকে ৩ জুলাই কী ভাবে অপসারিত করে মিশরিয় সেনা ? ৩০ জুন মুরসির সরকারের এক বছর পূর্তির দিন থেকে মিশরে শুরু হয় তামার্রুদ (বিদ্রোহ ) নামক মুরসি -বিরোধী আন্দোলন৷ এই আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল , যেহেতু দেশের বেহাল অর্থনীতিকে সামলাতে মহম্মদ মুরসির সরকার ব্যর্থ, অতএব তাঁদের ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া উচিত৷ সঙ্গে চলতে থাকে ‘শরিয়তি আইন ’, ‘ইসলামি রাষ্ট্র ’, ‘কপ্টিক সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন ’ প্রভৃতি জুজু দেখিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মুরসিবিরোধী ভাবমূর্তি নির্মাণের প্রচেষ্টা৷ ছয় দশক সামরিক শাসন , একনায়কতন্ত্রের শিকার একটি দেশের অর্থনীতিকে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই কেউ কোন যাদুতে উত্কর্ষে নিয়ে যেতে পারে , সে ব্যাখ্যা তামার্রুদ দিতে পারেনি৷ বিনিময়ে যেটা করেছে , কিছু মুবারক জামানার মার্কিন -ইজরায়েলপন্থী মিশরিয় পুিঁজপতি , সেনাকর্তাদের একত্রিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে৷ এদের উপর মার্কিন আর্শীবাদের প্রচ্ছন্ন হাত থাকলেও , প্রকট হচ্ছে ইজরায়েল ও সৌদি আরবের সমর্থন৷
ইজরায়েল সর্বদাই সাইনাইয়ের অপর প্রান্তে এমন একটি রাষ্ট্রপ্রধান চেয়ে এসেছে যে সাদাত -মুবারকের মতো মার্কিন সুরে সুর মেলাবে , প্যালেস্টাইনে জায়নবাদী আগ্রাসনের বিরোধিতা করবে না৷ অপর দিকে সৌদি রাজপরিবারও কখনই চায় না যে , আরব বিশ্বের কোথাও , বিশেষ করে সর্বাধিক জনসংখ্যার দেশ মিশরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক৷ কারণ এমনটা হলে সেই ঢেউ আছড়ে পড়বে লোহিত সাগরের পূর্বপ্রান্তে ঊষর মরুর ধূসর বুকে৷
আর আমেরিকা ? ইসলাম ও আধুনিকতা --- কোথাও রাজতন্ত্রের মূল্য নেই৷ নেই বাক -স্বাধীনতা রোধেরও৷ বা রাজনীতিকে বিরোধীশূন্য করার৷ অথচ এ সব কিছুই এত দিন করে এসেছে আরব বিশ্বের আমীর -ওমরাহরা৷ নারীদের অন্তঃপুরে ভরে রাখতে , সংখ্যালঘুদের ইসলাম যে মর্যাদার চোখে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাঁদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবেই দেখতে চায়৷ গোটা পৃথিবীতে এহেন অপব্যাখ্যার শিকার ‘ইসলামি ’ মতবাদকে চাপিয়ে দেওয়ার জন্য সৌদি রাজপরিবারের বিরুদ্ধে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালার অভিযোগ ওঠে৷ এরাই মিশরের কট্টরপন্থী সালাফি রাজনৈতিক দল আন -নুরের পৃষ্ঠপোষক৷ গত ৩ জুলাই টিভিতে সেনাপ্রধান আব্দেল ফাতাহ আল -সিসির মুরসিকে অপসারণের ঘোষণার মুহূর্তটি থেকে ১৪ অগস্টের হত্যাকাণ্ড --- এই আন -নুর পার্টি নেতৃবৃন্দ কিন্ত্ত সদাসর্বদা সেনাবাহিনীর সমর্থক৷ এই সব রাজপরিবার , সেনাবাহিনী , ধর্মান্ধদের সঙ্গে নিয়ে চলতে বিশ্ব জুড়ে গণতন্ত্রের ‘রক্ষক ’ আমেরিকার কোনও বাধানিষেধ নেই৷ যত সমস্যা মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো দলগুলিকে নিয়েই ? ৩ জুলাই একজন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত শাসক , সেনাপ্রধান দ্বারা অনৈতিক ভাবে উত্খাত হওয়ার ঘটনার যদি লোক দেখানো সমালোচনার পরিবর্তে প্রকৃত বিরোধিতা করত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র , রাষ্ট্রপুঞ্জ, তবে হয়তো আজ মিশরকে এই হত্যাকাণ্ড দেখতে হত না৷ আর পৃথিবীর সর্ববৃহত্ গণতন্ত্র ? ভারতবাসী ভুলেই গিয়েছে শেষ কবে নিজের দেশের সরকারকে কোনও আন্তজার্তিক সমস্যায় সোচ্চার হতে দেখেছে ! এমনকী অতীতের ভিয়েতনাম বা হালের শাহবাগ ইস্যুতে সোচ্চার কলকাতাবাসীকেও নীরব দেখা গেল সমগ্র মিশরকাণ্ডে৷ মিশরের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ১৯ অগস্টের মহসিন স্কোয়্যার থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মুসলিম সংগঠনগুলির পদযাত্রাটি তাই ‘ওদের কিছু একটা হচ্ছে ’ হয়েই থেকে গেল সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে ! এর আগেও ১৯৯১ সালে আলজেরিয়ায় নির্বাচনে জয়লাভের পরও সেনাবাহিনী ক্ষমতায় আসতে দেয়নি আব্বাসি মাদানির ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্টকে৷
তাঁদের নেতৃবৃন্দকে আটক করে৷ সে সময় একই পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল তিউনিসিয়ার ইসলামি পার্টি আন -নাহাদা প্রধান রশিদ -আল -গান্নুশিকে৷ অথবা তুরস্কের ইসলামপন্থী সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন আরবাকানকে৷ এঁরা সবাই কিন্ত্ত গণতন্ত্রে বিশ্বাসী , সন্ত্রাসে নয়৷ আর এটাই হল পাশ্চাত্যের মাথাব্যথার বড়ো কারণ৷ সৌদিরা যখন নারীদের ড্রাইভিং লাইসেন্স পর্যন্ত দিতে নারাজ , তখন এই উদার ও মধ্যমপন্থী ইসলামি দলগুলি মহিলাদের ভোটে জিতিয়ে সংসদে পাঠায়৷ ইয়েমেনে এঁদেরই দলের এক নারী তাওয়াক্কুল কারমান শান্তির জন্য নোবেল পায়৷ এই সব দল ভোটে জিতলে অমুসলিমদের ক্যাবিনেটে জায়গা দেয়৷ যেমন মুরসির সরকারের বিজ্ঞান গবেষণা মন্ত্রী নাদিয়া জাখারি একাধারে নারী আবার কপ্টিক খ্রিস্টান৷ চলতি মাসে সেনা আক্রমণের সময় মুসলিম ব্রাদারহুড সদস্যদের চার্চ পাহারা দিতেও দেখা গিয়েছে৷ আবার তেহরির স্কোয়্যারে এই খ্রিস্টানদেরই বছর দু’য়েক আগে নমাজের সময় ব্রাদ্রারহুড সদস্যদের মুবারক সেনার হাত থেকে বাঁচাতে পাহারা দিতে দেখা গিয়েছিল৷ এই কপ্ট-ব্রাদার সম্পর্ক মোটেও ভালো চোখে দেখেনি আমেরিকা৷ তাই গণমাধ্যমে পুরো অন্য ছবি তুলে ধরেছে৷ মুরসির দল তালিবান বা সালাফিদের ধর্মীয় কঠোরতাকে সমালোচনা করে৷ মুসলিম ব্রাদারহুডের এক তাত্ত্বিক নেতা ইউসুফ আল -কারজাভির একটি বিখ্যাত উক্তি হল , ‘যে বলে ইসলাম ও গণতন্ত্র পরস্পরবিরোধী , সে না তো ইসলামকে বোঝে , না গণতন্ত্রকে৷ ’ মুরসি , আরবাকান বা গান্নুশি ---সবাই কিন্ত্ত পাশ্চাত্যে পড়াশোনা করেছেন৷ কোট -প্যান্ট , টাইয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য৷ তার পরও বেছে নেননি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদারি বা ধর্মীয় গোঁড়ামির পথকে৷ এটাই তাঁদের জনপ্রিয়তার বড়ো কারণ৷ পাশ্চাত্য এবং তাঁদের আরব সঙ্গীরা খ্রিস্টান বিশ্বের ‘সেক্যুলার মডার্নিটি’-র এই বিকল্পটিকে তাই ঠেকাতে মরিয়া৷ কখনও গণমাধ্যম দিয়ে , কখনও সেনা অভ্যুত্থান বা রাজতন্ত্র৷ দখলের লড়াইয়ে কে জেতে এখন সেটাই দেখার !
Source: Ei Samay


ভালো লাগল। লেখাটা চোখ খুলে দিয়েছে।
ReplyDeleter4bia zindabad
ReplyDelete